শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১, ০৪:১১ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে চুলের তৈরি টুপি যাচ্ছে চীন!

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • হালনাগাদ সময় : শনিবার, ২২ মে, ২০২১
  • ২৬ বার
কুড়িগ্রামের প্রথম বারের মতো চুল দিয়ে তৈরি করা মাথার টুপি রপ্তানি হচ্ছে চীন দেশে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন জেলার সীমান্তবর্তি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নারী উদ্যোক্তা। নিজে স্বাবলম্বি হবার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন আরো ৩০নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সীমান্ত ঘেঁষা প্রত্যন্ত এলাকায় এমন ব্যতিক্রমি কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চন্দ্রখানা বালাতাড়ি গ্রামের কৃষক হেছার আলী মেয়ে লাইজু খাতুন। বাণিজ্যিকভাবে মাথার চুল দিয়ে টুপি তৈরী করে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এই নারী উদ্যোক্তা। কৃষক হেছার আলীর তার পাঁচ মেয়ের মধ্যে চতুর্থ নম্বর। বড় তিন মেয়ের অর্থাভাবে লেখা পড়া করাতে না পেরে বিয়ে দিয়ে দেন দরিদ্র কৃষক। তবে শত বাঁধার মুখেও নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় লাইজু খাতুন রংপুর সরকারি কলেজ থেকে বাংলা বিষয় মার্স্টাস সম্পন্ন করেন। আর সব ছোট মেয়েকে এসএসসি পাশ করেছে। লাইজু খাতুন দারিদ্রতাকে জয় করে ২০১০সালে এসএসসিতে জিপিএ-৪.১৯ পয়েন্ট ২০১২সালে এইচএসসি জিপিএ-৪.৭০ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে বাংলা বিভাগ নিয়ে অনার্স ও মার্স্টাস প্রথম স্থান অধিকার করে।
লাইজু খাতুন নিজেই স্বাবলম্বি হওয়ার পাশাপাশি গরীব-অসহায় পরিবারের শতাধিক নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। চুলের টুপি দেশ-বিদেশে রপ্তানির সুযোগ থাকায় ইতিমধ্যেই গ্রামের গরীব-অসহায় পরিবারের ৩০জন নারীকে দিয়ে চুলের টুপি তৈরি করে রপ্তানী করছেন তিনি। এই নারী উদ্যোক্তার কাছে টুপি তৈরি করে প্রতি মাসে ৫/৮ হাজার টাকা আয় করে পরিবারে তাদেওে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। সরকারী-বেসরকারী ভাবে সুযোগ-সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে অবহেলিত এলাকার শতশত নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
উদ্যোক্তা লাইজু খাতুন বলেন,আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ও স্বপ্ন ছিল একজন সফল উদ্যোক্তা হবো। পাশাপাশি গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করবো। এই স্বপ্নটা পুরণ করতে আমার স্বামীর সহযোগীতায় ময়মসিংহে ৫দিন এবং ঢাকা উত্তরায় ১০ দিন চুল দিয়ে টুপি তৈরির প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামের ৩০জন নারীকে আমার নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় একমাসের প্রশিক্ষণ দেই। আমার বাবার বাড়ীতে একটি টিনসেড ঘরে স্বপ্ল পরিসরে “সিনহা বিনতে সামিউল হেয়ার ক্যাপ নিটিং লিঃ”প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করি চলতি বছরের তিন মাস আগে। প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু করি। গড়ে মাসে ৯০-১০০টি চুলের টুপি তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি টুপিতে গড়ে সাড়ে তিনশ টাকা খরচ করে ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫শ টাকায়। আমাদের তৈরিকৃত চুলের টুপি গুলো ঢাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চীনে রপ্তানি করে। ২০১৫সালের উপজেলার পাশর্^বর্তি শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের সোনাইকাজী গ্রামের আজিজার রহমানের ছেলে সামিউল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে পারিবারিক বিয়ে হয়। তার স্বামী একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে আড়াই বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
নারী শ্রমিক নাসিমা বেগম বলেন,আমার স্বামী দিন মজুরির টাকা সংসারের চার জনের চলে। কাজ জুটলে সেদিন পেটে খাবার যায় না হলে এক/আধ বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। লাইজু আপার এডে কাজের সুযোগ পাইছি। গত তিন মাস থাকি মাসে ৪/৭ হাজার টাকা আয় করছি। এতে করে হামার সংসারে অভাব কমি গেছে।
নারী শ্রমিক খাদিজা বেগম বলেন,মোর স্বামী দিন মজুরি করিয়া সংসার চালায়। এই করোনার-ফরোনার মধ্যে তেমন কাম কাজ জোডে না। ঠিক মতো সংসারও চলে না। মুই লাইজু আপার এডে কাম করং চুল দিয়া টুপি বানার তাতে খাটুনি কম হয়। মজুরিও ভালো পাওয়া যায়। এতে সংসার ভালই চলছে। আমরা আশা করি লাইজু আপার এই প্রতিষ্ঠান আরো বড় হোক। হামার এলাকার মহিলা গুলাও কাম করি খাবার পাক।
৯ম শ্রেণীর ছাত্রী নিশি আকতার বলেন, করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সংসারের বসে থেকে বাড়তি খরচের চাপ হয়ে গেছে। লাইজু আপার চুলের টুপি তৈরির বিষয়টি জানতে পারি। পরে প্রশিক্ষণের সময় দেখলাম কম পরিশ্রমে আয় করা সম্ভব। তাই এই চুলের টুপি তৈরির কাজ করে মাসে ৫/৭হাজার টাকা আয় করছি। এতে করে আমি নিজের ও সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি।
অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনিছা আক্তার বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় ১০জন শিক্ষার্থী লাইজু আপার প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করছি। তারাও পড়ালেখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দ্বাঁড়ানো স্বপ্ন দেখছেন।
উদ্যোক্তা লাইজু খাতুনের স্বামী সামিউল ইসলাম সেলিম বলেন,লাইজু খুবেই মেধাবী একজন নারী। সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরেও চাকুরি করার ইচ্ছে ছিল না। ওল্টো স্বপ্ন দেখত সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে নিজে সাবলম্বি হয়ে গ্রামের অবহেলিত নারীদের সাবলম্বি করে তুলবেন।তাই স্বামী হিসাবে স্ত্রীর স্বপ্ন পুরণের জন্য তাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ এবং নিজেদের জমানো অর্থ দিয়ে ৩০জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও বিভিন্ন কাঁচামালসহ এ যাবদ দেড় লাখ টাকা খরচ করেছে। আমার স্ত্রী যেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে আশা করছি প্রতিষ্ঠানটি টেঁকানো সম্ভব। স্ত্রী লাইজুসহ প্রতিষ্ঠানের ৩০নারীর জন্য সাফল্য কামনা করছি।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সোহেলী পারভীন বলেন,এটা খুবেই ভাল উদ্যোগ। নারীরা সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত হোক সকলের চায়। লাইজুর প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে লাইজুর প্রতিষ্ঠানটি সমিতির অন্তভুক্তির মাধ্যমে রেজিষ্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হলে উপজেলার শতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আমার বিশ্বাস।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমান দাস বলেন,উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবেই ইতিবাচক। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত- বাংলার আলো বিডি
themesba-lates1749691102